কুয়াকাটায় ভূমিহীন ও অসহায় পরিবারের আর্তনাদ

News News

Desk

প্রকাশিত: ১০:৪১ অপরাহ্ণ, জুন ২৫, ২০২১

মোঃ সাইমুন ইসলাম, পটুয়াখালী জেলা প্রতিনিধিঃ দেশের সর্বদক্ষিণে পটুয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চল কুয়াকাটা অবস্থিত। কুয়াকাটা উপকূল অঞ্চলের পশ্চিমে ম্যানগ্রোভ লেম্বুর বন আন্ধার মানিক নদীর মোহনা পর্যন্ত রয়েছে বেড়িবাঁধ। সাগরের তীব্র ঢেউ আছরে পরে এই বেড়িবাঁধঘেষে, যার কবলে যুগযুগ ধরে হচ্ছে তীরের বালু ক্ষয়। বিগত কুয়াকাটার এই পশ্চিমে ছিল ভূমিহীন ও অসহায় স্থানীয় কয়েক শতাধিক পরিবারের বসবাস। যা সময়ের পরিক্রমায় সৈকতে তীরের বালুক্ষয়ের কবলে সর্বস্ব হাড়িয়ে আশ্রয় নিয়েছে বেড়িবাঁধে। ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ পরবর্তী অনেক ভূমিহীন পরিবার সহায়তা পেয়েছে ‘রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি’র বরাদ্দকৃত জমি ও ঘড়। এসকল পরিবারের মধ্যে যারা বরাদ্দকৃত সহায়তা পায়নি তাদের নির্দিষ্ট মালিকানাধীন জমাজমি না থাকার কারনে এবং বর্তমানে কুয়াকাটা উপকূল অঞ্চলের পশ্চিম দিকের ভূমি ও বনাঞ্চল সাগরের বুকে বিলীন হয়ে যাওয়ার ফলে এখানে বসবাসরত অনেক পরিবার কুয়াকাটা উপকূল অঞ্চলের পূর্বদিকে তীরবর্তী সরকারি খাস জমিতে আশ্রয় নিয়েছে জীবন জীবিকার তাগিদে।

আয়শা বানু (৬০) কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে বলেন, সাগর পারে সরকারের জাগায় থাহি হ্যাও বেড়িবাঁধের লগে ঠ্যাকছে , বহুত কষ্টে রোজগার হইরা খাই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি মোর অসহায় দুঃখিনীর মোহের দিগে চাইয়া অল্পঅইলেও স্থায়ী জাগার ঠিকানা দেতে হেলে বাচ্চাগো লইয়া থাকতে পারতাম, হ্যার লইগা দোয়া হরতাম।

কুয়াকাটা থেকে উপকূলীয় অঞ্চলের পূর্বে গঙ্গামতি নদীর মোহনা পর্যন্ত আনুমানিক তিন হাজার একর জুড়ে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ৮০ শতাংশ জমি এবং বনাঞ্চল সাগর গর্ভে হারিয়ে গেছে কয়েক শতকে। বাকি ২০ শতাংশ বনাঞ্চল এবং ভূমি অবশিষ্ট যেটুকু রয়েছে তাও মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে!
যা প্রতি বছরের পরিবর্তনে গিলে খাচ্ছে সাগরের তীব্র জো-এ।

উপকূলের এ অঞ্চলে আনুমানিক ২হাজার পরিবার বসবাস করে আসছে যুগযুগ ধরে।

কুয়াকাটার স্থানীয় উপকূলবাসীর ৮০ শতাংশ মানুষ জেলে; প্রধান উপজীব্য পেশা মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করা; বাকি ৩০ শতাংশ মানুষ পেশায় দিনমজুর, কেউ ভ্যান চালক, বাকিরা রয়েছে অন্যান্য ক্ষুদ্র পেশায় জড়িত।
পুরুষের পাশাপাশি এখানে নারীরাও পিছিয়ে নেই; পরিশ্রম করে পরিবারের সিংহভাগ মেটায় অধিকাংশ জেলে ও দিনমজুর পরিবারের নারীরা। তবে আয় এবং ব্যয়ে উপকূলে এসব পরিবার দিনশেষে সমান-সমান।
জবুল হক (৫০) বলেন, মুই দিন মজুর! মানষের কাম হইরা যে টাহা কামাই হরি হ্যাদিয়া কোনোরহম খাই, তয় এই কামাই দিয়া মোর জাগাজমি কেনা তৈফিকে কুলায় না। সরকার যদি মোরো একটু স্থায়ী ভিঠা-জাগার ব্যাবস্থা হইরা দেতো হেলে আর এই সাগরের কিনারে থাহা লাগদে না।

কুয়াকাটা পৌরসভায় উপকূল অঞ্চলে সাগর তীরবর্তী ২০ শতাংশ মানুষের বসবাস। বাকি ৮০ শতাংশ গঙ্গামতি নদীর মোহনা পর্যন্ত বসবাস করে আসছে।

উপকূলের কুয়াকাটা পৌর অধীনে অবস্থিত অর্ধশতাধিক পরিবারে খোজ নিয়ে যানা যায়, কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট হতে ফয়েজ মিয়ার ‘ফার্মস এন্ড ফার্মস’ থেকে ঝাউবন ও কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যানের অভ্যন্তরে কয়েক শতাধিক ভূমিহীন পরিবার বসবাস করছে। এখানে হাতেগোনা কিছু পরিবার জীবিকা নির্বাহের মধ্যেও স্থায়ী বসতবাড়ির জন্য বেড়িবাঁধের অন্যত্র জমাজমি করতে পারলেও বাকি তিন শতাধিক পরিবার রয়েছে ভাসমান; অস্থায়ীভাবে সরকারি খাস জমিতে ভূমিহীন অবস্থায়। তাদের জমাজমি ক্রয় করা যথারীতি সামর্থ্যের বাইরে, যে কারনে তারা এই সাগরের সকল প্রতিকূলতার মুখোমুখি হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
বিষয়ে ভূমিহীন আবুল হোসেন (৪০) বলেন, মোরা বহুকাল ধইরা বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, প্রাকৃতিক দূর্যোগের মোহে লড়াই হইরা বাইচ্চা আছি। জোয়ারের পানি মোগো উঠানে আয়, সাগর ভাইঙ্গা বেড়িবাঁধের লগে ঠেইক্কা গ্যাছে। এহন মোগো যাওনের কোনো জাগাজমি নাই, কোনহানে যাইয়া খাড়ামু?

‘ঢাকা টাইমস’ প্রতিবেদককে কুয়াকাটা উপকূল অঞ্চলের পৌরসভার অধীনে থাকা শতাধিক পরিবার জানিয়েছেন, উপকূলের অধিকাংশ ভূমিহীন পরিবার রোজগার করে কোনোভাবে সংসারের ভারবহন করে থাকে; সেখানে সামান্য একটি বাড়িঘর নির্মানের জন্য জমাজমি কেনার মতো সামর্থ হয়না এসকল পরিবারের। যেমনটা ‘নূন আনতে পানতা ফুরায়!’
এ বিষয়টি যেকোনো মানুষের মানবিক দৃষ্টিকোণের বিবেকে নাড়া দেয়।

তারা আরো বলেন যে, বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে অসহায় ও ভূমিহীন অনেক পরিবারকে একটি ঘর ও জমি বরাদ্দ দিয়েছেন পর্যায়ক্রমে।
তবুও মুজিব জন্মশতবার্ষিকীতে এসে উপকূলের ভূমিহীন সকল পরিবার ভূমি ও ঘড় থেকে বঞ্চিত রয়েছে।
তারা আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন যে, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাতো বলেছিলেন এদেশের একজন মানুষও গৃহহীন এবং ভূমিহীন থাকবে না! আমরা তো যুগযুগ ধরে ভূমিহীন অবস্থায় রয়েছি।

এসকল ভূমিহীন ও অসহায় পরিবারের শতাধিক সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবী করেছেন যেন তারা সরকারের দেয়া কিছু জমি পায় যেখানে তারা স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পেতে পারে।
এই ভূমিহীন পরিবারগুলো ঠায় বুক পেতে দাঁড়িয়ে আছে সরকারের দেয়া সামান্য জমি বরাদ্দ পাওয়ার আশায়।