জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে

News News

Desk

প্রকাশিত: ১১:২১ অপরাহ্ণ, মে ১৫, ২০২১

সৈয়দ নাঈমঃ স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে জনগণের প্রতিনিধিত্বে সর্বোচ্চ ফোরাম জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে; তিনিই জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে জিতে হয়েছিলেন দেশের প্রথম সংসদ নেতা।

সেই পথে ধরে জাতির জনকের জন্মশতবার্ষিকীতে বসছে একাদশ সংসদের বিশেষ অধিবেশন। উদ্দেশ্য, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সেই অবিসংবাদিত নেতাকে স্মরণ করা।

দেশের ইতিহাসের প্রথমবারের মতো ‘বিশেষ অধিবেশনে’ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ পালনের যখন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তখন সংসদ নেতা বঙ্গবন্ধুরই মেয়ে শেখ হাসিনা। বাবার হাত ধরে যার রাজনীতিতে আসা, তিনি এখন প্রধানমন্ত্রী।

সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য আজীবন সংগ্রাম করে যাওয়া জাতির জনকের জন্মশতবর্ষে সংসদে বঙ্গবন্ধুর জীবনের উপর আলোচনা করবেন সংসদ সদস্যরা।

এই বিশেষ অধিবেশনই সংসদের ইতিহাসের প্রথম কোনো অধিবেশন যেখানে সংসদ কক্ষে ব্ঙ্গবন্ধুর ছবি থাকবে।

রোববার সন্ধ্যা ৬টায় বসবে এই বিশেষ অধিবেশন। এই অধিবেশনেই পরদিন স্মারক বক্তৃকা দেবেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী সাড়ম্বরে উদযাপনে এ বছরকে ‘মুজিববর্ষ’ ঘোষণা করে নানা কর্মসূচি নিয়েছিল সরকার। তার অংশ হিসেবে গত ৯ জানুয়ারি সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে এই বিশেষ অধিবেশন করার সিদ্ধান্ত হয়।

কথা ছিল, ২২-২৩ মার্চ এই বিশেষ অধিবেশন হবে। অধিবেশনের শুরুতেই রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের ভাষণ দেবেন। এরপর বঙ্গবন্ধুর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন নিয়ে একটি প্রস্তাব পাস হবে।

কিন্তু বিশ্বের অন্য সব দেশের মত বাংলাদেশেও করোনাভাইরাসের প্রকোপ বাড়তে থাকলে মুজিববর্ষের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান কাটছাঁট করা হয়, সংসদের বিশেষ অধিবেশনও স্থগিত হয়ে যায়।

এর আগে ১৯৭৪ সালের ৩১ জানুয়ারি ও ১৮ জুন সংসদে যে বিশেষ বৈঠক বসেছিল, সেখানে যুগোস্লাভিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো এবং ভারতের রাষ্ট্রপতি বরাহগিরি ভেঙ্কট গিরি ভাষণ দিয়েছিলেন।

এবার মার্চে যে বিশেষ অধিবেশন ডাকা হয়েছিল, সেখানে প্রতিবেশী দেশগুলোর স্পিকারদের আমন্ত্রণ জানানোর কথা ছিল; কিন্তু তখন তা স্থগিত হয়।

সেই বিশেষ অধিবেশন বসানোর আলোচনা শুরু হয় গত সেপ্টেম্বর মাসে। সে সময় প্রস্তুতিমূলক বৈঠকও করে সংসদ সচিবালয়।

দেশের প্রথম সংসদের অধিবেশন বসেছিল ১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিল। পাঁচ বছর মেয়াদ হলেও ৭৫ এ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর নানা পটপরিবর্তনে সেই সংসদ টিকে থাকে ১৯৭৫ সালের ২ নভেম্বর পর্যন্ত।

 

প্রথম সংসদের আগে গণপরিষদে সংবিধান গৃহীত হয়। সংবিধান প্রণয়নের পর ভেঙে যায় গণপরিষদ।

প্রথম সংসদ গঠিত হওয়ার প্রথম অধিবেশনে সংসদের আসন ছিল ৩০০টি। আর সংরক্ষিত মহিলা আসন ছিল ১৫টি, কালক্রমে যা বর্তমানে ৫০টি।

প্রথম সংসদের স্পিকার ছিলেন মোহাম্মদউল্লাহ। তিনি পরে রাষ্ট্রপতি হলে সংসদের সভাপতির আসনে বসেন আব্দুল মালেক উকিল।

বঙ্গবন্ধু হত্যার দীর্ঘসময় পর তার কন্যা শেখ হাসিনা সংসদ নেতার চেয়ারে বসেন সপ্তম সংসদে। এরপর নবম, দশম ও চলতি একাদশ সংসদেও সংসদ নেতা তিনি।

শেখ হাসিনা বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে সংসদে দায়িত্ব পালন করেন তৃতীয়, পঞ্চম ও অষ্টম সংসদে।

‘এই সিটে আর বসব না, এটা কম দুঃখ না’

সারা জীবনব্যাপী গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম সংসদে সংসদীয় রীতিপদ্ধতি নিয়ে তার ভাবনার কথা বলেছিলেন। সেই সময় আইনসভা ছিল বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠান অল্প কিছু পরেই ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন হলে তরুণ শেখ মুজিব হন দলের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান। এরপর একের পর নানা আন্দোলনে তৎকালীন পূর্ববাংলার সাধারণ মানুষের নেতা হয়ে ওঠেন শেখ মুজিব।

বাঙালির স্বাধিকারের আন্দোলনে প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব দেওয়া শেখ মুজিবকে বারবার জেলে যেতে হয়। ছাত্র-জনতার দেওয়া ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হন তিনি।

আন্দোলনের নানা পটভূমিতে ৭১ এর রক্তক্ষয়ী মুক্তসংগ্রামে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে ফেরেন বঙ্গবন্ধু। এরপর শুরু হয় দেশ গঠনের কাজ।

শুরুতেই গণপরিষদের মাধ্যমে রচিত হয় স্বাধীন দেশের সংবিধান। যার মাধ্যমে স্বাধীন দেশের প্রথম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

ওই নির্বাচনে ২৯৩ আসন পায় আওয়ামী লীগ। বাকি সাতটার মধ্যে ৫টি স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জেতে। একটি জাসদ এবং আর একটি আসন পায় বাংলাদেশ জাতীয় লীগ। ওই সংসদে কোনো বিরোধী দলীয় নেতা ছিল না।

প্রথম সংসদের প্রথম বৈঠকের দিন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর তাদের অভিনন্দন জানাতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, “…আমরা যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছি, সে ইতিহাসে যেন খুঁত না তাকে। দুনিয়ার পার্লামেন্টারি কনভেনশনে যেসব নীতিমালা আছে, সেগুলো আমরা মেনে চলতে চাই। সঙ্গে সঙ্গে যেন এমন একটি পার্লামেন্টারি প্রসিডিওর ফলো করতে পারি, যাতে দুনিয়া আমাদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।

“…এখানে কোন দল বা মতের নয়-এখানে এই দেখব যে, প্রত্যেক সদস্য যেন যার যে অধিকার আছে, সে অধিকার ব্যবহার করতে পারেন। সেদিকে আপনিও (স্পিকার) খেয়াল রাখবেন বলে আমি আশা পোষণ করি। এ সম্পর্কে আপনি আমাদের পূর্ণ সহযোগিতা পাবেন। পার্লামেন্টারি ট্রাডিশন পুরোপুরিভাবে ফলো করতে আমরা চেষ্টা করব।”

সংসদ নিয়ে নিজের আবেগের জায়গা বোঝাতে গিয়ে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংসদে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী প্রস্তাব পাস হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “…আজ আপনারা কন্সটিটিউশন সংশোধন করে আমাকে প্রেসিডেন্ট করে দিয়েছেন। আমার তো ক্ষমতা কম ছিল না। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সম্স্ত ক্ষমতা আপনারা দিয়েছিলেন। আমার দুই-তৃতীয়াংশ মেজরিটি দরকার। তা আমার আছে। মাত্র ৭ ছাড়া সমস্ত সদস্যই আমার। তবু আপনারা এমেন্ডমেন্ট করে আমাকে প্রেসিডেন্ট করেছেন। এই সিটে আমি আর বসব না- এটা কম দুঃখ না আমার। আপনাদের সঙ্গে এই হাউসের মধ্যে থাকব না-এটা কম দুঃখ নয় আমার।”

 

 

[তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ হাসিনা ও বেবী মওদুদ সম্পাদিত, আগামী প্রকাশনী]