দক্ষিণাঞ্চলের তিন নদীর পানি হঠাৎ লবাণাক্ত

News News

Desk

প্রকাশিত: ১২:২৩ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৭, ২০২১

সোহাগঃ মিঠাপানির নদী মেঘনা, কীর্তনখোলা ও তেঁতুলিয়ায় হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে লবণাক্ততা। সপ্তাহখানেক আগে বিষয়টি টের পেলেও কেউ পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি প্রথমে।

 

কিন্তু দুই-তিন দিন ধরে লবণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় চিন্তিত হয়ে পড়েন নদীর পাড়ের মানুষগুলো। দৈনন্দিন কাজ সারতে নদীর পানিই যে তাদের ভরসা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন- শুষ্ক মৌসুমে উজানের পানি কম প্রবাহিত এবং সঠিক পরিমাণে বৃষ্টিপাত না হওয়া, দূষণসহ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই দক্ষিণাঞ্চলের অধিকাংশ নদীর পানি লবণাক্ত হয়ে উঠেছে। এতে করে জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে, শঙ্কা রয়েছে পরিবেশ বিপর্যয়েরও।

পরিবেশবিদরা বলছেন, ২০২০ সাল থেকে চলতি ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত কীর্তনখোলা নদীর পানিতে তড়িৎপরিবাহিতা (ইলেকট্রিক্যাল কন্ডাক্টিভিটি বা ইসি) অনেক কম ছিল। গেল মার্চ মাসে সেটি বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। এমনকি গত ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চে পানির তাপমাত্রাও বেড়েছে। এসব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, করোনাকালে মানুষ ঘরবন্দি থাকায় বেশ ভালো ছিল নদীর পানি।

কীর্তনখোলা নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল বরিশাল নগরীর ভাটারখাল কলোনির বাসিন্দারা জানান, সপ্তাহখানেকেরও বেশি সময় ধরে নদীর পানিতে লবণের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। মুক্তিযোদ্ধা পার্কসংলগ্ন কীর্তনখোলায় গোসল করতে যাওয়া অনেকেই পানি মুখে দিয়ে লবণের উপস্থিতি টের পান। প্রথমে বিষয়টি নিয়ে কেউ ভ্রƒক্ষেপ না করলেও ডিসি ঘাট থেকে স্থানীয় দোকানিরা চায়ের পানি সংগ্রহ করতে গেলে তারাও এটি লক্ষ্য করেন। এর পরই কীর্তনখোলা নদীর পানি লবণাক্ত হওয়ার বিষয়টি লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে। একইভাবে ছড়িয়ে পড়ে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার ঘটনা। এ বিষয়ে বরিশাল নদীবন্দরসংলগ্ন কোস্টগার্ড জেটি এলাকার চা বিক্রেতা সোহেল রানা জানান, প্রথমে নদীর পানি লবণাক্ত হয়ে ওঠার কথা ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে শোনেন। পরে তিনি নিজেও মুখে নিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত হন।

স্থানীয় বাসিন্দা জসিম উদ্দিন বলেন, ‘প্রথমে ধারণা করা হচ্ছিল শহরের ভেতর থেকে বয়ে আসা খালের মুখের পাশের জায়গার নদীর পানিই কেবল লবণাক্ত। তাই এটি স্বাভাবিক ধরে নিয়েছিলেন সবাই। পরে বিভিন্ন স্থান থেকে নদীর পানিতে লবণ থাকার খবর ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি চা বানাতে গিয়ে তাতে লবণের উপস্থিতি পান বিক্রেতারাও।’ স্থানীয়রা বলছেন, শুধু পানি লবণই নয়, গোসল করার পর চুলগুলো কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে, যা আগে কখনই হয়নি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন ও বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলন বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী রফিকুল আলম বলেন, ‘২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত একটি সার্ভে করেছিলাম। তাতে দেখা যায়, শুষ্ক মৌসুমে সাগরের লবণপানি তেঁতুলিয়া নদী পর্যন্ত চলে আসছে। তখন পরিবেশ অধিদপ্তরসহ দায়িত্বশীল সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে বিষয়টি জানানো হয়। সম্প্রতি আমরা বেশ কিছু মাধ্যমে শুনতে পারছি মেঘনা, কীর্তনখোলা ও তেঁতুলিয়া নদীর পানিতে লবণাক্ততা বেড়েছে। এ জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরকেই এসব নদীর পানি পরীক্ষা করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে আমাদের জলজ সম্পদের ক্ষতি হবে। পাশাপাশি মানুষের জীবন-জীবিকা এবং জীববৈচিত্র্যের

ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী বায়োকেমিস্ট মো. মুনতাসির রহমান অবশ্য বলেন, প্রতিমাসেই নদীর পানি পরীক্ষা করা হয়। তাতে দেখা যায়, গেল ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে মেঘনা, কীর্তনখোলা ও তেঁতুলিয়া নদীর পানির অনেকটাই পরিবর্তন এসেছে। আমাদের সময়কে তিনি বলেন, ‘চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে কীর্তনখোলা নদীর ছয়টি স্পট থেকে পানি সংগ্রহ করা হয়। পরে পরীক্ষা করে পানিতে তড়িৎপরিবাহিতা পাওয়া গেছে পার সেন্টিমিটারে ৩১৪ থেকে ৩৪০ মাইক্রোসিমেন্স। এর আগেও সেটি ৩০০ থেকে ৪০০-এর মধ্যেই ছিল। কিন্তু মার্চে পার সেন্টিমিটারে মাইক্রোসিমেন্স পাওয়া গেছে এক হাজার ৩৩১ থেকে এক হাজার ৩৬২ পর্যন্ত, যা মানদ-ের থেকেও অনেক বেশি। এটি অবশ্যই চিন্তার বিষয়। তাই নিয়মিত মনিটরিং রাখা হচ্ছে।’ বিষয়টি নিয়ে অধিকতর বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হবে বলে জানান এই পানিবিশেষজ্ঞ।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোস্টাল স্ট্যাডিজ অ্যান্ড ডিজস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান ড. হাফিজ আশরাফুল হক বিজয়ের বাংলাদেশকে জানান, নদীর পানিতে ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চে লবণাক্ততা কয়েক গুণ বেড়েছে। এর মূল কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। বর্তমানে উপকূলীয় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ দক্ষিণাঞ্চলের সব এলাকার নদীর পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে গেছে। এ বছর আবার বৃষ্টি হয়নি এখনো। বৃষ্টিপাত হলে স্বাভাবিকভাবেই স্যালাইনিটি লেভেল কমে যেত। তিনি বলেন, ‘উজান থেকে যে পরিমাণ পানি প্রবাহিত হওয়ার কথা, সে পরিমাণ না এলে সমুদ্রের পানিটা বাইব্যাক করে নদীতে চলে আসে। তখন লবণাক্ততার পরিমাণ স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। তবে দুই মাসের পরীক্ষার ফল এটি নিশ্চিত করে বোঝায় না যে, এটি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। আমাদের আরও একটু সময় অপেক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি তড়িৎ পরিবাহিতা বেড়ে যাওয়াতে কী ধরনের ক্যামিক্যাল কম্পোজিশনগুলো বেড়েছে সেগুলোও জানতে হবে। তা হলেই বোঝা যাবে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ।’ ড. হাফিজ আশরাফুল হক বলেন, ‘লবণাক্ততা বেড়ে গেলে নদীতে বসবাসকারী প্রাণীর গ্রোথ হ্যাম্পার হবে। পাশাপাশি অনেক প্রজাতি হারিয়ে যেতে পারে। ইলিশসহ নানা ধরনের মাছের উৎপাদনেও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সেটি এখনো নিশ্চিত করে বলা যাবে না।’

পরিবেশ অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) কামরুজ্জামান সরকার আমাদের সময়কে বলেন, ‘প্রতিমাসেই মেঘনা, কীর্তনখোলা ও তেঁতুলিয়াসহ বরিশালের ১৫টি নদীর পানি পরীক্ষা করা হয়। ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পানির পরীক্ষার প্রাপ্ত ফলে তড়িৎপরিবাহিতা ও স্যালাইনিটির প্যারামিটারগুলো সীমার মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু মার্চে ড্রামাটিক্যালি তড়িৎপরিবাহিতার মান অনেক বেড়ে গেছে। আমরা বিষয়গুলো লক্ষ্য করছি।